পারব না কে, না বলো। নিজেকে খুজে বের করো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তি দের একজন-- জেফ বেজোস ভয়কে করতে হবে জয় হার না মানার গল্প  গুগল ও ফেজবুকের প্রতিষ্ঠাতা সবচেয়ে বেস্ট মটিভেশনাল স্পিকার-  সন্দীপ মহেশ্বরী

Sunday, January 27, 2019

বিশ্ববিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম

সারা পৃথীবিতে আলোড়ন সৃষ্টিকারি একজন মহান বিজ্ঞানী হলেন বাংলাদেশের জামাল নজরুল ইসলাম।   এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম  ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ সালে।


নজরুল ইসলামের বয়স যখন মাত্র বছর তখনই তার বাবা কলকাতায় বদলি হন। তাই জামাল নজরুলের ছেলেবেলা কাটে কলকাতাতেই। জামাল নজরুল প্রথমে ভর্তি হন কলকাতার মডেল স্কুলে। এই স্কুল থেকে পরবর্তীতে শিশু বিদ্যাপীঠে। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এই বিদ্যাপীঠেই পড়েন। সেখানে ৪র্থ শ্রেণী সম্পন্ন করে তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে চলে আসেন পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। 

এখানে একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি চমৎকার কৃতিত্ব দেখান। ফলেডবল প্রমোশনপেয়ে সরাসরি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলে পড়াশোনা করলেও পশ্চিম পাকিস্তানের লরেন্স কলেজ থেকে লেভেল এবং লেভেল পাস করেন।

জামাল নজরুল ইসলামের স্কুলজীবন শুরু হয় কলকাতায়, সেখান থেকে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন, শেষে পাকিস্তানের লরেন্স কলেজ থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেন। বিএসসি সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। ১৯৬০ সালে কেমব্রিজ থেকে মাস্টার্স। ১৯৬৪ সালে এখান থেকেই প্রায়োগিক গণিত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর . ইসলাম অত্যন্ত দুর্লভ সম্মানজনক ডক্টর অব সায়েন্স বা ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ছাত্রজীবনে তাঁর সমসাময়িক আজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বিস্ময়কর বিজ্ঞান-প্রতিভা স্টিফেন হকিং।

জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল ফেলো ১৯৭১-৭২ দুই বছর ক্যালটেক বা ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং অধ্যাপক । ১৯৮৩ সালে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বের কসমোলজিস্টদের মধ্যে হইচই পড়ে যায়।

দ্রুত বইটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। পরের বছর কেমব্রিজ থেকেই প্রকাশিত হয় ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি। তাঁর গবেষণা আইনস্টাইন-পরবর্তী মহাবিশ্ব গবেষণায় বিরাট অবদান রেখেছে। তিনি এই ধারায় গবেষণা অব্যাহত রেখে পরবর্তীকালে লেখেন ফার ফিউচার অব দ্য ইউনিভার্স বা মহাবিশ্বের দূরবর্তী ভবিষ্যৎ।

সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ কখনো এক সরলরেখায় এলে পৃথিবীর ওপর তার প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তবে গবেষণায় প্রফেসর ইসলাম আশার কথাই শুনিয়েছিলেনসে রকম ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কেমব্রিজ এবং পশ্চিমে শিক্ষার গবেষণা অধ্যাপনায় থাকাকালে তাঁর বন্ধু সুহৃদমহল গড়ে ওঠে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তাঁর শিক্ষক ফ্রিম্যান ডাইসন, পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান, ভারতের সুব্রহ্মনিয়াম চন্দ্রশেখর, পাকিস্তানের আবদুস সালাম, ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন অমিয় বাগচী প্রমুখ। হকিংয়ের কথা তো আগেই এসেছে।


১৯৮৪ সালে প্রফেসর ইসলাম তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। পশ্চিমের উন্নত দেশে ৩০ বছরের অভ্যস্ত জীবন, সম্মানজনক পদ, গবেষণার অনুকূল পরিবেশ, বিশ্বমানের গুণীজন সাহচর্য এবং আর্থিকভাবে লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দুই মেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফিরে এলেন। এলেন একেবারে নিজ জেলা চট্টগ্রামে। অতি দামি চাকরি ছেড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে যোগ দিলেন মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে।
এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না। দেশে ফিরে আসার চিন্তাটা প্রথম থেকেই আমার মধ্যে ছিল, এর ভিন্নতা ঘটেনি কখনোই। আরেকটা দিক হলো বিদেশে আপনি যতই ভালো থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থা সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব ছিল না।


দেশে ফিরে এসে একদিকে জামাল নজরুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণাগার আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান গাণিতিক ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র বা রিচার্স সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স (আরসিএমপিএস), যেটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দেশের প্রবীণ পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর এম হারুন-অর রশিদপৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আগত খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী, আপেক্ষিকতত্ত্ববিদ এবং বিশ্ব সৃষ্টি তাত্ত্বিকদের অবদানস্মরণ করে প্রতিষ্ঠানকে প্রফেসর ইসলামের শ্রেষ্ঠ কীর্তি আখ্যা দিয়েছিলেন। এখানে তিনি উচ্চতর গবেষণার ছাত্রদের সহায়তার পাশাপাশি অনেক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করেছেন, যাতে অনেক নোবেলজয়ীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের পণ্ডিতজন যোগ দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এই সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান আজ যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করতে পারছে না।


এই সরল বিশ্বাসপ্রবণ মানবতাবাদী মানুষটি বিশেষত চট্টগ্রাম সমাজের নানা সংস্থা উদ্যোগে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মূল্যবান সময়ের অনেকখানিই এভাবে ব্যয়িত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁকে চিন্তিত রাখত। সমাজে হিংসা হানাহানি, ক্ষমতাবানের দৌরাত্ম্য, চরমপন্থা অসহিষ্ণুতার প্রকোপ তাঁকে খুবই কষ্ট দিত। মানুষের মধ্যে লোভ আর স্বার্থপরতা দেখলেও তিনি খুব মনঃকষ্টে ভুগতেন। আবার তাঁর সারল্যের সুযোগ নিতেও অনেকে কসুর করেনি।


উন্নয়নের নামে প্রকৃতি, পরিবেশ গরিবের স্বার্থবিরোধী কাজ দেখলে তিনি হতাশ ক্ষুব্ধ হতেন। একপর্যায়ে তিনি নিয়ে কঠোর সমালোচনা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হতেন না; বহুতল ভবন, যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ এবং বঞ্চনা বৈষম্যের অর্থনীতি, কালোটাকা অবৈধ সম্পদের ছড়াছড়ির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।


আর পাশ্চাত্য যখন ইরাকে আক্রমণ চালায়, তখন এই মনীষীও, তাঁর প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের মতো, পশ্চিমা সভ্যতার ওপর আস্থা হারিয়েছিলেন। ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী মানুষটি রবীন্দ্রনাথের মতোই মানুষের ওপর শেষ পর্যন্ত আস্থা হারাতে চাননি। তবে বহুমূল্যে তিনি জেনেছিলেন, নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা যায় কেবল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে। 



 এই মহান মানুষটি  ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ মধ্যরাতে মহান বিজ্ঞানী আমাদের ছেড়ে গেছেন।


0 Comments:

Post a Comment