পারব না কে, না বলো। নিজেকে খুজে বের করো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তি দের একজন-- জেফ বেজোস ভয়কে করতে হবে জয় হার না মানার গল্প  গুগল ও ফেজবুকের প্রতিষ্ঠাতা সবচেয়ে বেস্ট মটিভেশনাল স্পিকার-  সন্দীপ মহেশ্বরী

Saturday, April 20, 2019

জগদীশ চন্দ্র বসু


জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০শে নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি অঞ্চলের ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের প্রকৃত বাসস্থান ছিল বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে। তার পিতা ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী ভগবান চন্দ্র বসু তখন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন


স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি প্রখ্যাত বাঙালি উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক বাড়ি। এটি শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়ীখাল গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এর দুরুত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার।



১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশ চন্দ্র ভারতে ফিরে আসেন। তৎকালীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল জর্জ রবিনসন, প্রথম মার্কুইস অব রিপন অনুরোধে স্যার অ্যালফ্রেড ক্রফট বসুকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি এই নিয়োগের বিপক্ষে ছিলেন। শুধু যে তাঁকে গবেষণার জন্য কোন রকম সুবিধা দেওয়া হত না তাই নয়, তিনি ইউরোপীয় অধ্যাপকদের অর্ধেক বেতনেরও কম অর্থ লাভ করতেন। এর প্রতিবাদে বস্য বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং তিন বছর অবৈতনিক ভাবেই অধ্যাপনা চালিয়ে যান। দীর্ঘকাল ধরে এই প্রতিবাদের ফলে তাঁর বেতন ইউরোপীয়দের সমতুল্য করা হয়।

প্রেসিডেন্সি কলেজে গবেষণার কোন রকম উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় ২৪-বর্গফুট (. মি২) একটি ছোট ঘরে তাঁকে গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হত। পদে পদে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁর বিজ্ঞান সাধনার প্রতি আগ্রহ ভগিনী নিবেদিতাকে বিস্মিত করেছিল।



বিবাহ

১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে অবলার বিয়ে হয়। অবলা ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গা মোহন দাসের কন্যা। বিয়ের আগে অবলা বসু কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চাইলেও তাকে ভর্তি হতে দেয়া হয়নি, কারণ সেখানে তখন মেয়েদের পড়ানো নিষেধ ছিল। ১৮৮২ সালে বঙ্গ সরকারের বৃত্তি নিয়ে অবলা মাদ্রাজে যান পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করলেও অসুস্থতার কারণে আবার ফিরে আসতে বাধ্য হন। 


তাদের বিয়ের সময় জগদীশচন্দ্র বসু আর্থিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন। এর মধ্যে আবার তিনি তখন কলেজ থেকে বেতন নিতেন না। এছাড়া জগদীশের বাবার কিছু ঋণ ছিল যার কারণে তার পরিবারকে পথে বসতে হয়। এর মধ্য থেকে অবলা জগদীশ অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসেন এবং সব ঋণ পরিশোধ করতে সমর্থ হন। সব ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কিছুদিন মাত্র বসুর পিতা-মাতা জীবিত ছিলেন।


 তরঙ্গ সৃষ্টি প্রেরণ পরিক্ষা

জগদীশের আঠারো মাসের সেই গবেষণার মধ্যে মুখ্য ছিল অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা। ১৮৯৫ সালে তিনি অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং কোন তার ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তা প্রেরণে সফলতা পান। ১৮৮৭ সালে বিজ্ঞনী হের্ৎস প্রতক্ষভাবে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন যদিও শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। জগদীশচন্দ্র তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে সর্বপ্রথম প্রায় মিলিমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। ধরণের তরঙ্গকেই বলা হয়ে অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাউক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডারটেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান প্রদান ঘটে থাকে।



রেডিও উন্নয়নে তাঁর অবদান

বোসের কাজ ছিলো মূলত রেডিও মাইক্রোওয়েব অপটিক্স এর তাত্ত্বিক দিক নিয়ে। অর্থাৎ তিনি তাঁর গবেষণায় এই তরঙ্গের প্রকৃতি প্রণালী ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর গবেষণার দ্বারা যোগাযোগের উদ্দেশ্যে বেতার যন্ত্রের উন্নয়নের দিকে কোনো ইচ্ছা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি যখন একদিকে বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তখন মার্কোনিও গবেষণা করে যাচ্ছেন একই বিষয়ে। শুধু পার্থক্য হচ্ছে বোস করছেন তাত্ত্বিক গবেষণা, তিনি যন্ত্রের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তিত না। কিন্তু মার্কোনি বেতার যন্ত্র উন্নত করে রীতিমত হুলস্থূল করে ফেলছেন এবং বেতার টেলিগ্রাফের উন্নয়নে অনেক দূর অগ্রসরও হয়েছেন।

সমসাময়িক সময়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও রেডিও তরঙ্গের ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। যেমন রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার স্টেপানোভিচ পপোভ রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে বজ্রপাত ডিটেক্টর (lightning detector) তৈরীর চেষ্টা করছিলেন। বোসের রেডিও যন্ত্র উন্নয়নের প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিলো না। এমনকি তিনি নিজের গবেষণাপত্র অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সুবিধার্থে উন্মুক্ত করে দিতেন। পেটেন্ট এর প্রতি ছিলো তাঁর তীব্র অনুরাগ। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তাঁর আবিষ্কৃত গ্যালেনা ক্রিস্টাল ডিটেক্টরের কার্যপ্রণালী নিজের লেকচারেই বিবৃত করেন। তাঁর একজন আমেরিকান বন্ধু এই যন্ত্রটির জন্য তাকে পেটেন্ট নিতে বলেছিলেন কিন্তু তিনি সেটা করেন নি।

রেডিও গবেষণায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে তিনিই সর্বপ্রথম রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করতে সেমিকন্ডাক্টর জাংশন ব্যবহার করেন। এখনকার সময়ে ব্যবহৃত অনেক মাইক্রোওয়েভ যন্ত্রাংশের আবিষ্কর্তাও তিনি। তাঁর গবেষণা থেকেই ১৯৫৪ সালে পিয়ার্সন ব্রাটেইন রেডিও তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল ব্যবহার করেন।




পাঠকের হয়তো মনে আছে যে জগদীশ চন্দ্র একবার কলকাতায় মিলিমিটার তরঙ্গ ব্যবহার করে দূরে একটি ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউটিশনে তিনি তাঁর এই কাজের ব্যাখ্যা করেন। সে সময় তিনি ওয়েভগাইড (Wave guide****), হর্ণ এন্টেনা, ডাই-ইলেক্ট্রিক লেন্স, পোলারাইজার এবং সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করেছিলেন যাদের দ্বারা তৈরী তরঙ্গের কম্পাংক ছিলো প্রায় ৬০ গিগাহার্জের মতো। তাঁর তখনকার আবিষ্কৃত বেশ কয়েকটি যন্ত্র এখনো বোস ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত আছে। জেনে অবাক হতে হয় যে তাঁর সেই গবেষণা থেকেই তৈরী করা . মিলিমিটার মাল্টি বিম রিসিভার যা এখন আমেরিকার এরিজোনায় অবস্থিত NRAO 12 Meter Telescope- ব্যবহৃত হচ্ছে।



উদ্ভীদের ও যে প্রাণ আছে তার প্রমান:

বিজ্ঞানে বোসের অবদানের মধ্যে এক বিরাট অংশ জুড়ে আছে জৈবপদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্স। তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন যে উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে ইলেক্ট্রন প্রবাহের ঘটনা ঘটতে পারে। একে এক সময় রাসায়নিক ক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হত। বোস এই ধারণাকে পরবর্তীতে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি উদ্ভিদের টিস্যুর উপর মাইক্রোওয়েভের প্রভাব এবং এর ফলে কোষ মেমব্রেনের বিভব (cell membrane potential) পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ

১৯০১ সালে বোস বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন অবস্থায় এবং বিভিন্ন সময়ে কোষ মেমব্রেন বিভবের পর্যবেক্ষণ করে অনুমিত করেন যে উদ্ভিদও প্রাণীর মতো বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সাড়া দিতে সক্ষম, অর্থাৎ তাদের ভেতর কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তারা ব্যথা অনুভব করতে সক্ষম, আনন্দ অনুভব করতে সক্ষম, এমনকি স্নেহ অনুভব করতেও সক্ষম। তিনি আরো প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের একটি সঠিক জীবন চক্র এবং প্রজনন তন্ত্র রয়েছে যা প্রাণীর অনুরূপ। তাঁর এই গবেষণাপত্র তখন লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে স্থান করে নিয়েছিলো।

উদ্ভিদও যে তাপ, শীত, আলো, শব্দ অন্যান্য অনেক বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান করতে পারে সেই কথা বোস প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। আর এই প্রমাণের জন্য নিজেই তৈরী করেছিলেন ক্রিস্কোগ্রাফ (Crescograph) নামক বিশেষ যন্ত্রের। এই যন্ত্রের বিশেষত্ব হলো বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে উদ্ভিদে উৎপন্ন উদ্দীপনাকে এটি রেকর্ড করতে সক্ষম। এটি উদ্ভিদ কোষকে এদের সাধারণ আকার থেকে প্রায় ১০,০০০ গুণ বিবর্ধিত করে দেখাতে সক্ষম ছিলো যার দ্বারা সহজেই উদ্ভিদ কোষের উপর বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সৃষ্ট স্পন্দন বা গতিকে প্রত্যক্ষ করা যেত। এর দ্বারাই তিনি দেখেন যে উদ্ভিদ কোষ প্রাণী কোষের মধ্যে বেশ কয়েকটি সাদৃশ্য আছে।

বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণা কতটা সত্য এবং বাস্তব, প্রত্যেক বাঙালিমাত্রই তা অনুধাবন করতে সক্ষম। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, পুকুরের ধারে, নদীর কূলে কূলে প্রায় সর্বত্র দেখা যায় লজ্জাবতী লতা নামে এক গুল্ম। ইংরেজিতে একে বলা হয় Mimosa (Touch me not) গাছকে ছোঁয়ামাত্রই দেখা যাবে, কীভাবে গাছটি লজ্জায় সব পাতা গুটিয়ে নিচ্ছে। দেখলেই বোঝা যায়, জীবন্ত প্রাণী হচ্ছে এই গুল্মরাজি। এমন কোনো বাংলার ছেলেমেয়ে নেই, যারা লজ্জাবতী লতাকে স্পর্শ করার আনন্দ উপেভোগ করেনি। বিজ্ঞানী বসু তার শৈশব কৈশোরে লজ্জাবতী গাছের স্পর্শ থেকে প্রথমে অনুভব করেন, বৃক্ষের প্রাণ আছে, তারই গবেষণা করতে গিয়ে প্রমাণ করেছেন একটি বাস্তবতাকে। আচার্য বসু তার গবেষণা নিয়ে দুটি বই লেখেন: জীবন্ত প্রাণহীন জীবনের প্রতিক্রিয়া ১৯০২ (Response in the living and non-living) এবং উদ্ভিদের স্নায়ু সম্বন্ধীয় কৌশল ১৯২৬ (Nervous Mechanism of Plants).


এই মহান মানবটি ২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭, গিরিদিহ, ভারতে মৃত্যু বরণ করেন


0 Comments:

Post a Comment