পারব না কে, না বলো। নিজেকে খুজে বের করো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তি দের একজন-- জেফ বেজোস ভয়কে করতে হবে জয় হার না মানার গল্প  গুগল ও ফেজবুকের প্রতিষ্ঠাতা সবচেয়ে বেস্ট মটিভেশনাল স্পিকার-  সন্দীপ মহেশ্বরী

Wednesday, July 10, 2019

সক্রেটিসের জিবনের গল্প (জেনে নিই সব কিছু)


মনিষীদের জিবনীর  এই পর্বে   বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব সক্রেটিস।

দিন শেষ হয়ে আসছিল। দুজন মানুষ তার চেয়েও দ্রুত এগিয়ে চলছিলেন। ঐ  আধার নামার আগেই তাদের পৌছতে হবে ডেলফিতে। একজনের নাম চেরোফোন। মধ্যবয়সী গ্রীক। দুজনে এসে থামলেন ডেলফির বিরাট মন্দির প্রাঙ্গণে । সিড়ি বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই মন্দিরের পূজারী  এগিয়ে এল। চেরোফোন তার দিকে চেয়ে বললেন,  আমরা দেবতার  কাছে একটা বিষয় জানবার জন্য এসেছি। পূজারী বলল আপনারা প্রভূ অ্যাপেলের মূর্তির সামনে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিন আর বলুন আপনার কি জানতে চান?

কুৎসিত চেহারার মানুষিটি প্রথমে এগিয়ে এসে বললেন, আমি সক্রেটিস, প্রভু আমি কিছুই জানিনা। এবার চেরোফোন নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, হে সর্বশক্তিমান দেবতা, আপনি বলুন, গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী কে?

চেরোফেনের কথা শেষ হতেই চারিদিক কাপিয়ে আকাশ থেকে এক দৈববাণী ভেসে আসল।
(পড়তে থাকুন পেয়ে যাবেন কি এসেছিল দৈব বাণীতে)


 সক্রেটিস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯ তে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা সফরেনিকাশ ছিলেন স্থপতি। পাথরের নানান মূর্তি গড়তেন। মা ফেনআরেট ছিলেন ধাত্রী। পিতা মাতা দুজনেই দুই পেশায় নিযুক্ত থাকলেও সংসারে অভাব লেগেই থাকত। তাই ছেলেবেলায় পড়াশুনার পরিবর্তে পাথর কাটার কাজ নিতে হলো। কিন্তু অদম্য জ্ঞানস্পৃহা সক্রেটিসের । সক্রেটিস দেখতে মোটেও সুদর্শন ছিলেননা। টাকবিশিষ্ট মাথা, চ্যাপ্টা অবনত নাক, ছোট ছোট চোখ, স্ফীত উদর এবং অস্বাভাবিক গতিভঙ্গির সমন্বয়ে গঠিত ছিল তার সামগ্রিক চেহারা। দেহের শ্রী তেমন না থাকলেও তার রসবোধ ছিল প্রখর। রঙ্গ করে প্রায়শই বলতেন: "নাসারন্ধ্রটি বড় হওয়ায় ঘ্রাণ নেয়ার বিশেষ সুবিধা হয়েছে; নাকটি বেশী চ্যাপ্টা হওয়াতে দৃষ্টি কোথাও বাঁধা পায়না।"যখন যেখানে যেটুকু জানার সুযোগ পান সেইটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করেন। এমনি করেই বেশ কয়েক বছর কেট যাই। একদিন ঘটনা চক্রে পরিচয় হলো এক ধনী ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি সক্রেটিসের ভদ্রতা ও মধুর আচরণে মুগ্ধ হয়ে তার পড়াশুনার দায়িত্ব নেন।

 এই সময় গ্রীস দেশ ছোট ছোট রাজ্যে  বিভক্ত ছিল। ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ,ক্ষমতার দ্বন্দ লেগেই থাকত। দেশের প্রতিটি তরুণ, যুবক, সক্ষম পুরুষদের যুদ্ধে যেতে হত। । সক্রেটিসকেও  এথেন্সের সৈন্যবাহিনীর সাথে  যুদ্ধে যেতে হয়েছিল।

 যুদ্ধ বিগ্রহকে খুব বেশি একটা পছন্দ করতে পারলেন না তিনি। ফিরে  এলেন এথেন্সে। এথেন্স তখন জ্ঞান অর্জনের জন্য সবচেয়ে উত্তম জায়গা। এই পরিবেশে নিজেকে জ্ঞানের জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না সক্রেটিস। তিনি ঠিক করলেন জ্ঞানের চর্চায়, বিশ্ব প্রকৃতির জানবার সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করনে।

সক্রেটিসের জ্ঞানার্জন ::

প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন। খালি পা,  গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোন দোকানে , মন্দিরের চাতালে কিম্বা বন্দু বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন , নিজে েএমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না। বোঝেন না। লোকের জাছ থেকে জানবার জন্যে প্রশ্ন করছেন। আসেল  তর্ক করা ছিল সে যুগের এক শ্রেণীর  লোকদের ব্যবসা।  এদের বলা হতো সোফিস্ট।



 যারা নিজেদের পান্ডিত্যের অহঙ্কার করত, বীরত্বের বড়াই করত, তিনি সরাসরি তাদের জিজ্ঞেস করতেন, বীরত্ব বলতে তারা কি বোঝে? পান্ডিত্যের স্বরূপ কি। তারা যখন কোন কিছু উত্তর দিত, তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত।  এই কারণে শত্রুও অনেক সৃষ্টি হয়ে গেল সক্রেটিস এর।

নিজের আদর্শ সত্যের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা। সেই সাথে ছিল অর্থ সম্পদের প্রতি চরম  উদাসীনতা। একবার তার বন্ধু  এ্যালসিবিয়াদেশ তাকে বাসস্থান তৈরি করবার জন্য বিরাট একখন্ড জমি দিতে চাইলেন। সক্রেটিস বন্ধুর দান ফিরিয়ে দিয়ে কৌতুকে বললেন, আমার প্রয়োজন একটি জুতার আর  তুমি দিচ্ছ একটি বিরাট চামড়া এ নিয়ে  আমি  কি করব।

সক্রেটিসের সাংসারিক জিবন:: 

 সক্রেটিস এর স্ত্রী  জ্যানথিপি ছিলেন ভয়ঙ্কর রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে তিনি সক্রেটিসের উদাসীনাত তিনি মেনে নিতে পারতেন না। একদিন সক্রটিস গভীর একাগ্রতার সাথে একখানি বই পড়ছিলেন। প্রচন্ড বিরক্তিতে জ্যানথিপি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিনউত শেষ পর্যন্ত  আর ধৈর্য রক্ষা করতে না পেরে  বাইরে গিয়ে আবার বইটি পড়তে আরম্ভ করলেন। জ্যানথিপি আর সহ্য করতে না পেরে এক বালতি পানি  এনে মাথায় ঢেলে দিলেন।  সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম এত মেঘগর্জন হচ্ছে তখন শেষ পর্যন্ত এক পশলা বৃষ্টি হবেই।


সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এল মেলেতুল, লাইকন, আনীতুস নামে এথেন্সের তিনজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক। এই অভিযোগের বিচার করবার জন্য আলোচনার সভাপতিত্তে ৫০১ জনের জনের বিচারকমন্ডলী গঠিত হলো। এই বিচারকমন্ডলীর সামনে সক্রেটিস এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

সক্রেটিসের বক্তব্য :: 

 “হে এথেন্সের অধিবাসী গণ, আমার অভিযোগকারীদের বক্তৃতা শুনে আপনাদের কেমন লেগেছে জানি না, তবে আমি তাদের বক্তৃতায় চামকে আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম, যদিও তাদের কথাই সত্য ভাষণের চিহ্নমাত্র নেই্।  এর উত্তরে  আমি আমার বক্তব্য পেশ করছি। আমি অভিযোগকারীদের মত মার্জিত ভাষার ব্যাবহার জানি না। আমাকে শুধু ন্যায় বিচারের স্বার্থে সত্য প্রকাশ করতে দেওয়া হোক।

কেন আমি আমার দেশবাসীর বিরাগভাজন হলাম? অনেক দিন আগে ডেলফির মন্দিরে দৈববানী শুনলাম তখনেই আমার মনে হলো এর অর্থ কি। আমি তো জ্ঞানী নই তবে দেবী কেন  আমাকে দেবীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, এই দেখো আমার চেয়ে জ্ঞানী মানুষ।

 আমি জ্ঞানী মানুষ মানুষ খুজতে আরম্ভ করলাম। প্রথমে আমি গেলাম কবিদের কাছে।  তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম তারা প্রকৃতই অজ্ঞ। তারা ঈশ্বরদত্ত শক্তি ও প্রেরণা থেকেই সব কিছু সৃষ্টি করেন। জ্ঞান থেকে নয়।  শেষ পর্যন্ত গেলাম শিল্পী, কারিগরিদের কাছে। তারা এমন অনেক বিষয় জানেন যা আমি জানি না। কিন্তু তারাও কবিদের মত সব ব্যাপারেই নিজেদের চরম জ্ঞানী বলে মনে করত আর এই ভ্রান্তিই তাদের প্রকুত জ্ঞানকে ঢেকে রেখেছিল।  িএই অনুসন্ধানের জন্র আমার অনেক শত্রু সৃষ্টি হলো। লোকে আমার নামে অপবাদ দিল, আমিই নাকি একমাত্র জ্ঞানী কিন্তু ততদিনে আমি দৈববাণীর অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছি।"


সক্রেটিসের মৃত্যু : 

 প্লেটোর ফিডো গ্রন্থের শেষে সক্রেটিসের মৃত্যুর পর্বের বর্ণনা উদ্ধৃত আছে। কারাগার থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে সক্রেটিস ক্রিটোর অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। হিমলক বিষ পানের পর সক্রেটিসকে হাটতে আদেশ করা হয় যতক্ষণ না তার পদযুগল ভারী মনে হয়। শুয়ে পরার পর যে লোকটি সক্রেটিসের হাতে বিষ তুলে দিয়েছিল সে তার পায়ে পাতায় চিমটি কাটে। সক্রেটিস সে চিমটি অনুভব করতে পারেননি। তার দেহ বেয়ে অবশতা নেমে আসে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুর পূর্বে তার বলা শেষ বাক্য ছিল: "ক্রিটো, অ্যাসক্লেপিয়াস আমাদের কাছে একটি মোরগ পায়, তার ঋণ পরিশোধ করতে ভুলো না যেন।" অ্যাসক্লেপিয়াস হচ্ছে গ্রিকদের আরোগ্য লাভের দেবতা। সক্রেটিসের শেষ কথা থেকে বোঝা যায়, তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন মৃত্যু হল আরোগ্য এবং দেহ থেকে আত্মার মুক্তি।

তার মৃত্যুর পরেই এথেন্সের মানুষ ক্ষোভে দুৎখে ভেটে পড়ল । চারদিতে ধিক্কার ধ্বনি উঠল। বিচারকদের দল সর্বত্র একঘরে হয়ে পড়ল। অনেকে অনুশোচনায় আত্মহত্যা করলেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে মেনেতুসকে পিটিয়ে মারা হল, অন্যদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হল। দেশের লোকেরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিরাট মূর্তি প্রতিষ্ঠা করল।  মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার নশ্বর দেহের শেষ হলেও চিন্তার শেষ হয়নি। তার শিষ্য প্লেটো, প্লোটোর শিষ্য অ্যারিষ্টটলের মধ্যে দিয়ে সেই চিন্তা রএক নতুন জগৎ সৃষ্টি হল যা মানুষকে উন্নিত করেছে আজকের পৃথিবীতে।




0 Comments:

Post a Comment